নীলাকাশ টুডেঃ আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) মানদণ্ডে জিডিপির ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৈদেশিক ঋণ নিলে ওই দেশ ঝুঁকিমুক্ত।

বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের অনুপাত ১২ দশমিক ১৫ শতাংশ। ঋণ নিয়েছে ১.৩৫ শতাংশ সুদে। ঋণ পরিশোধের রের্কড ও সক্ষমতা উভয় ক্ষেত্রে আইএমএফ’র মানদণ্ডে শক্তিশালী অবস্থানে আছে।

সব মিলে দেশি ও বৈদেশিক ঋণের অঙ্ক বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোর তুলনায় ভালো অবস্থানে আছে বাংলাদেশ। এ পরিস্থিতিতে আইএমএফ বাংলাদেশকে ঋণ দিচ্ছে ২ দশমিক ২ শতাংশ সুদে।

এছাড়া করোনা ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে সৃষ্ট সংকটে অন্যান্য দেশের তুলনায় সামষ্টিক অর্থনীতি এখনও ভালো অবস্থানে। ফলে সার্বিক দিক বিবেচনায় বাংলাদেশকে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে অনেক শর্ত থেকে সরে আসছে আইএমএফ। তবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ঋণ নিয়ে আলোচনার শুরুতে অনেক বেশি শর্ত আরোপ করেছিল সংস্থাটি। সংশ্লিষ্ট সূত্রে পাওয়া গেছে এসব তথ্য।
অনেক শর্তে আইএমএফ আপস করার কারণেই অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেছেন যেভাবে ঋণ চেয়েছি ঠিক সেভাবেই পেয়েছি। আইএমফ’র কাছে বাংলাদেশ ৪৫০ কোটি ডলার ঋণ সহায়তা চেয়েছে। বুধবার সংস্থাটি এই ঋণ দিতে সম্মত হয়। আগামী ৩ মাসের মধ্যে সংস্থার বোর্ড সভায় চূড়ান্ত অনুমোদনের পর ফেব্রুয়ারিতে প্রথম কিস্তি পাওয়া যাবে।
জানতে চাইলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাবেক সিনিয়র সচিব মাহবুব আহমেদ বলেন, আইএমএফ’র দেওয়া শর্তগুলোকে আমি শর্ত হিসাবে দেখছি না। কারণ অর্থনীতির জন্য এসব কাজ করতে হবে-এটি আমি অনুভব করি। সরকারকে আয় বাড়াতে বলেছে। অনেক আগ থেকে আমরা এটি বলে আসছি। নাকে খত দিয়ে টাকা দিয়েছে এমনটি মনে করি না। তবে কাজগুলো এখন সময়মতো বাস্তবায়ন করতে হবে। তিনি মনে করেন-এখন খাদ্য, সার, জ্বালানি আমদানি করতে অনেক ব্যয় হচ্ছে। বাজেট সহায়তা হিসাবে আইএমএফ’র ঋণের অর্থ এসব খাতে ব্যয় করা হবে।

ঋণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত অর্থ বিভাগের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, আলোচনা শুরুর দিকে আইএমএফ বলেছিল বাংলাদেশের অনেক খাতে সংস্কার করতে হবে। সংস্কার ছাড়া ঋণ পাওয়া যাবে না। কিন্তু তাদের সব শর্ত গ্রহণ করা হয়নি। সরকার ইতোমধ্যে যেসব খাতে সংস্কার করছে এর তালিকা সংস্থাটিকে দেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত আইএমএফ সেগুলো মেনে নিয়েছে। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের মানদণ্ড নয়, আইএমএফ আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করেই ঋণ দেয়। বাংলাদেশ সে মানদণ্ডের ওপরের দিকে আছে।
অর্থ বিভাগ সূত্র জানায়, কোনো দেশকে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে আইএমএফ আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে কয়েকটি সূচক মূল্যায়ন করে থাকে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে সামষ্টিক অর্থনীতি। এই মুহূর্তে নানা সংকটের মধ্যেও দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির অবস্থা অন্যান্য দেশের তুলনায় ভালো দেখতে পেয়েছে সংস্থাটি।

আইএমএফ পর্যালোচনা করে দেখেছে এ মুহূর্তে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের অনুপাত জিডিপির ৩৩ দশমিক ৮০ শতাংশ।

এটি সব উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় অনেক কম। অন্যান্য দেশের মধ্যে বিশেষ করে ভারতে এ ঋণের অনুপাত জিডিপির ৮৮ দশমিক ৮ শতাংশ, চীনের ৭২ শতাংশ, পাকিস্তানের ৮০ দশমিক ৯০ শতাংশ। এছাড়া ভিয়েতনামে বৈদেশিক ঋণের অনুপাত জিডিপির ৪৭ দশমিক ৮ শতাংশ, শ্রীলংকার ১১১ শতাংশ, ইন্দোনেশিয়ার ৬২ দশমিক ৩ শতাংশ। পাশাপাশি মালয়েশিয়ার ৪২ দশমিক ৩ শতাংশ, জাপানের ১৭১ শতাংশ, যুক্তরাজ্যের ৯৭ শতাংশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের ১০২ শতাংশ রয়েছে। ফলে এসব দেশের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে বাংলাদেশ একটি স্বস্তিদায়ক জোনে আছে।
সংস্থাটি পর্যালোচনা করে আরও দেখছে বর্তমান বাংলাদেশের জিডিপির আকার ৪৯ হাজার ৫০০ কোটি মার্কিন ডলার। এরমধ্যে বৈদেশিক ঋণের অঙ্ক ৫৯০০ কোটি ডলার। এটি জিডিপির ১২ দশমিক ৫ শতাংশ। আইএমএফ’র হিসাবে জিডিপির ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বিদেশি ঋণ একটি দেশের জন্য ঝুঁকিমুক্ত হিসাবে বিবেচনা করা হয়। সে হিসাবে বাংলাদেশ বিদেশি ঋণের ঝুকির মুক্তের অনেক ঊর্ধ্বে অবস্থান করছে।
এছাড়া বাংলাদেশ বৈদেশিক মোট ঋণের ৭৭ শতাংশ-বিশ্বব্যাংক, জাইকা, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক থেকে নিয়েছে। এসব সংস্থার ঋণের সুদের হার ১ দশমিক ৩৫ শতাংশ। ফলে বিদেশি ঋণের পোর্টফলিও পর্যালোচনায় বাংলাদেশ ঝুঁকিমুক্ত অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে।
সংস্থাটি পর্যালোচনা করে আরও দেখতে পেয়েছে-ঋণ পরিশোধের সক্ষমতায় বাংলাদেশ ভালো অবস্থানে আছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে ২১০ কোটি মার্কিন ডলার বিদেশি ঋণ ও সুদ পরিশোধ করেছে বাংলাদেশ। ওই সময় জিডিপির আকার ছিল ৪৬ হাজার ৫০০ কোটি মার্কিন ডলার। আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশকে বিদেশি ঋণের বিপরীতে ৪০০ কোটি মার্কিন ডলার পরিশোধ করতে হবে। ওই সময় জিডিপির সম্ভাব্য আকার দাঁড়াবে ৬৫ হাজার ১০০ কোটি ডলার। ফলে এতবড় অর্থনীতির আকারে এই ঋণ পরিশোধে সক্ষম হবে।
এদিকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের সক্ষমতার মাপকাঠির ওপর পর্যালোচনা রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়। ডেবথ সাসটেইনেবিলিটি অ্যানালাইসিস (ডিএসএ) ২০২০ সালের রিপোর্টে বলা হয়েছে বাংলাদেশ বৈদেশিক ঋণ বহনের ক্ষেত্রে অনেক বেশি শক্তিশালী অবস্থানে আছে। দেশটিতে বৈদেশিক ঋণের অঙ্ক কম। ফলে বর্তমান ঝুঁকির মধ্যে নেই।

অর্থ বিভাগের সূত্র আরও জানায়, সব সূচক পর্যালোচনা করেই আইএমএফ তাদের অনেক শর্তের সঙ্গে আপস করেছে। যদিও আজ থেকে ১০ বছর আগে এ ধরনের ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের অবস্থান আরও কঠিন ছিল।

এদিকে যেসব শর্ত দিয়েছে আইএমএফ সেগুলো বাস্তবায়ন করতে আরও ৩ বছর সময় পাবে সরকার। এ সময়ের মধ্যে খেলাপি ঋণ ১০ শতাংশের নিচে রাখা, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে এসেস ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি গঠন, ব্যাংকের মূলধন ব্যাসেল-৩ অনুযায়ী পূরণ করতে হবে।

রাজস্ব আদায় বাড়ানো ও ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন, গ্রস নয় রির্জাভের হিসাব নিট ভাবে করা, জ্বালানি তেলের মূল্য নির্ধারণে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে ওঠানামা পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে।