নীলাকাশ টুডেঃ শেষ লড়াইটা একেবারেই শেষ মুহূর্তে ‘ছুটে’ গিয়েছিল ২০১১ সালে। সেবার ভোটের মাত্র ৮ ঘণ্টা আগে বিএনপি দলীয় মেয়র প্রার্থী অ্যাডভোকেট তৈমুর আলম খন্দকারকে বসিয়ে দেয়া হয়েছিল দল থেকে। কিন্তু এবার স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েও নিজ দলের কেন্দ্র থেকে রীতিমত ‘হঠকারিতা’ ভরা নানামুখী সিদ্ধান্ত আসছে অ্যাডভোকেট তৈমুরকে নিয়ে।

এদিকে স্থানীয় বিএনপির একটি অংশও পরোক্ষ প্রত্যক্ষভাবে বিরোধিতা করছেন তৈমুরের নির্বাচন করাকে নিয়ে। অপরদিকে সরকারদলীয় প্রার্থী ডা. সেলিনা হায়াত আইভির ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় সমর্থন থাকলেও স্থানীয় আওয়ামী লীগে একটি বড় অংশ তার পক্ষে থাকবে না, এমনটা নিয়েই চলছিল আলোচনা-সমালোচনা।

বিশেষ করে প্রভাবশালী নেতা ও এমপি শামীম ওসমান ভোটের বাইরে থাকলেও কর্মী-সমর্থকরা মনে করছেন সরকারদলীয় প্রার্থীর জয় পরাজয়ের ক্ষেত্রে অন্যতম ইস্যু তিনি। যদিও এখনও পর্যন্ত নাসিক নির্বাচন ইস্যুতে মুখ খুলছেন না তিনি।

আর দলের বাইরে সাধারণ ভোটাররা মনে করছেন নিজেদের দল নিয়ে উভয় সংকটে আছেন এই উভয় হেভিওয়েট প্রার্থী।

তবে তৈমুর বলছেন তার ক্ষেত্রে দলীয় প্রতীক না থাকায় তিনি এখন মুক্ত, তিনি এখন জনতার। আর আইভী বলেছেন, দলীয় প্রতীকই তার জন্য বাড়তি চ্যালেঞ্জ। অনেক জায়গায় ভোটারদের বোঝাতে হচ্ছে আইভির মার্কা নৌকা।

জানা গেছে, নাসিক নির্বাচনে তৃনমূল থেকে মেয়র পদে সম্ভাব্য প্রার্থীদের নামের যে তালিকা কেন্দ্রে প্রেরণ করা হয়েছিল সেখানে ডা.সেলিনা হায়াত আইভির নাম ছিল না। সিটি কর্পোরেশনের ২৭টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত নারায়ণগঞ্জ মহানগর আওয়ামীলীগের কার্যকরী কমিটির প্রায় অর্ধশত সদস্য ও ২৬টি ওয়ার্ড শাখার নেতারা বিশেষ বর্ধিত সভা করে সেই তালিকা প্রেরণ করেছিলেন।

কিন্তু শেষতক দল থেকে মেয়র পদে নৌকার প্রার্থী করা হয় সেলিনা হায়াত আইভীকে। ফলে শুরু থেকেই আইভির পক্ষে দলের একটি অংশের মাঠে নামা নিয়ে সংশয় থাকলেও শেষ অবধি নৌকার পক্ষে মাঠে নামেন সবাই। এমনকি হকার সংঘর্ষের ঘটনাসহ ব্যক্তিগত কারণে সিটি কর্পোরেশন ও আইভির নিজে বাদী হয়ে দায়ের করা মামলায় মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এড.খোকন সাহাসহ সহযোগী সংগঠনের আসামী হওয়া শীর্ষ নেতারাও নেমেছেন নৌকা প্রতীকের পক্ষে।

বিশেষ করে শামীম ওসমানপন্থী হিসেবে পরিচিত সকল শীর্ষ নেতা ও কর্মীরাও অক্লান্ত পরিশ্রম করছেন নৌকার জন্য। গত সপ্তাহ থেকে প্রতিদিন নারায়ণগঞ্জ আসছেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নির্বাচন (নাসিক) পরিচালনা কমিটির নেতারাও।

তবে দলীয় নেতাকর্মীরা সাংগঠনিক শাস্তির কথা ভেবে সরাসরি মুখ না খুললেও সরকারদলীয় প্রার্থী সেলিনা হায়াত আইভির বেশ কিছু বক্তব্যে ক্ষোভ জানিয়েছেন অনেকেই।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে দলের একাধিক প্রবীণ নেতারা জানান, বিভেদ-ক্ষোভ ভুলে সব নেতাকর্মীরা একযোগে নৌকার জয় নিশ্চিত করতে মাঠে নামলেও আইভির কিছু বক্তব্য আমাদের ব্যথিত করছে। বিশেষ করে তৃনমূলের কর্মী সমর্থকরা বিষয়গুলো নিয়ে আমাদের প্রশ্নের সম্মুখীন করছে।

নেতারা বলেন, যে নৌকার প্রশ্নে আমরা এক পতাকা তলে দাঁড়িয়েছি সেই নৌকা পাওয়ার পর আইভী বলেছেন ‘ আইভির মার্কা আইভীই’। বিভিন্ন গণসংযোগে গিয়ে তিনি বলছেন, নৌকার প্রার্থী হলেও তার কাছে সব দলমতের লোকেরা সমান। সর্বশেষ মঙ্গলবার সিদ্ধিরগঞ্জে প্রচারণায় গিয়ে আইভী বলেছেন নৌকা প্রতীক তার জন্য বাড়তি চ্যালেঞ্জ। অনেক জায়গায় গেলে মানুষ নাকি তাকে প্রশ্ন করে। তিনি সবাইকে বোঝানোর চেষ্টা করেন তারা মার্কা নৌকা, এটা জাতীয় নির্বাচন না। তাই প্রতীক নিয়ে কোনো ঝামেলা হবে না।

প্রবীণ নেতৃবৃন্দ আক্ষেপ জানিয়ে বলেন, ৪০ বছরের রাজনৈতিক জীবনে দলের সভানেত্রী শেখ হাসিনাকেও কোথাও বলতে শুনিনি নৌকা নিয়ে নির্বাচন করা চ্যালেঞ্জের। সেখানে আইভী নৌকার সাথে নিজের ইমেজকে সমকক্ষ করে বক্তব্য দিয়ে আমাদের হৃদয়ে ক্ষরণ ঘটাচ্ছেন। তাকে ভুলে গেলে চলবে না, কেন্দ্রীয় নেতারাও আসছেন নৌকাকে জেতাতে, আইভীকে নয়।

অপরদিকে বিএনপি নেতা অ্যাডভোকেট তৈমুর আলম খন্দকার নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে নামার পরপরই নিজের দল থেকেই একের পর এক দ্বিধাদ্বন্দ্বের শিকার হচ্ছেন। তৈমুরের স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে মাঠে নামার পরপরই ভেঙ্গে পরা সাংগঠনিক শক্তি প্রদর্শনে সক্ষম হয় এখানকার নেতাকর্মীরা। বিশেষ করে গত ১৬ ডিসেম্বর ১৫ বছরের ব্যবধানে স্মরণকালের বিশাল শোডাউন দেয় বিএনপি। দলীয় নেতাকর্মীদের পাশাপাশি তৈমুরের পাশে দেখা মিলে সাধারণ মানুষের ঢল।

কিন্তু বিপত্তি দেখা দেয় গত ২৫ ডিসেম্বর। ওই দিন তাকে জেলা বিএনপির আহবায়ক পদ থেকে সরিয়ে ভারপ্রাপ্ত আহবায়ক মনিরুল ইসলাম রবিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ওই ঘটনার ৯ দিন পর গত সোমবার বিএনপির চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা পদ থেকে তাকে সরানো হয়।

এসব নিয়ে সরকারদলীয় নেতাকর্মীদের মাঝেও বেশ উৎফুল্লতা দেখা দিলেও স্থানীয় বিএনপির নেতাকার্মীরা মনে করছেন এটি বিএনপির নির্বাচনী কৌশল। কারণ ইতিমধ্যেই দলের মহাসচিব মীর্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর টেলিফোনে তৈমুরের পক্ষে মাঠে থাকার ব্যাপারে ইতিবাচক ইঙ্গিত দিয়ে বলেছেন, তৈমুরের জয় মানেই জনতার জয়।

মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এটিএম কামাল জানান, যেহেতু কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত রয়েছে এই সরকারের আমলে নির্বাচনে অংশ নিবে না, তাই স্থানীয় সরকার নির্বাচনে তৈমুরকে সরাসরি সমর্থন দিতে পারেনা বিএনপি। স্বতন্ত্র হিসেবে জনতার প্রার্থী হিসেবে নিশ্চিত করতেই তাকে দলের ২টি পদ থেকে সরিয়ে আনা হয়েছে।

তিনি বলেন, দলের পদ থেকে সরিয়ে দিলে নিশ্চয়ই বিএনপি নেতাকর্মীরা নৌকাতে ভোট দিবেন না। তৈমুরের বিজয়ের সম্ভাবনা অত্যন্ত দৃঢ় বলেই কেন্দ্র এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যাতে সাধারণ মানুষ দলীয় প্রতীকের ঝামেলায় না পরেন। যদিও জেলা বিএনপির একটি অংশ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে তৈমুরের বিরোধিতা করছেন। তারা বলছেন, দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে নির্বাচন করা উচিত হয়নি তৈমুরের।

ইতোমধ্যেই সিদ্ধিরগঞ্জের সাবেক বিএনপিদলীয় এমপি গিয়াস উদ্দিনের ছেলে স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর (সদ্য সাবেক) সাদরিল নিজেই সরকারদলীয় প্রার্থী আইভির সঙ্গে প্রচারণা করেছেন, নৌকায় ভোটে চেয়েছেন।

 

জেলা বিএনপির সদস্য সচিব মামুন মাহামুদ জানিয়েছেন, বিএনপি নির্বাচনে নেই, বিষয়টি স্পষ্ট করতে তৈমুরকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, সাবেক এমপি গিয়াসপন্থীরা পরোক্ষভাবে সরকারদলীয় প্রার্থীর পক্ষে মাঠে নেমেছেন। যদিও গিয়াস উদ্দিনকে দলীয় নেতাকর্মী বা মিডিয়াকর্মীদের কেউই পাচ্ছেন না গত ২ সপ্তাহ ধরেই।

এদিকে স্বতন্ত্র প্রার্থী তৈমুর আলম খন্দকারের ব্যাপারে নেয়া কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের খুব একটা মাথা ঘামাচ্ছেন না জেলা ও মহানগর বিএনপির নেতারা। জেলা বিএনপির আহবায়ক কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম টিটু, রুহুল আমিন শিকদার বলেন, আমরা দলের মহাসচিবের ইঙ্গিতকেই প্রাধান্য দিচ্ছি। সব রাজনৈতিক দলেরই নির্বাচন নিয়ে কৌশল থাকে।

তৈমুর আলম খন্দকারকে ঘিরে ঝিমিয়ে পরা বিএনপি আবার জেগে উঠেছে। যারা চাচ্ছেন এই বিএনপির এই জাগরণ আবার ঘুমিয়ে পরুক, তারা কখনওই দলের হিতাকাঙ্খী নয়।