নীলাকাশ টুডেঃ অবশেষে ৪ হাজার ৪০০ কোটি ডলারে টুইটার কিনে নিলেন বিশ্বের শীর্ষ ধনী ইলন মাস্ক। অথচ এ নিয়ে কী ঘটেনি—অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগ, চুক্তি থেকে সরে আসার ঘোষণা এবং শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হওয়া। মাস্কের টুইটার কেনার ঘটনাপ্রবাহের একটি ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে বিবিসির এক প্রতিবেদনে।

ব্রিটিশ সরকারি গণমাধ্যমটি জানায়, এই প্রক্রিয়ার শুরু গত মার্চে। মাসের শেষ দিকে ক্যালিফোর্নিয়ার সান জোসে বিশ্বের শীর্ষ ধনীর জন্য অনেকটা তড়িঘড়ি করে একটি বৈঠকের আয়োজন করা হয়।

বৈঠকটি টুইটারের জন্য ছিল বড় কিছু। কারণ, ইলন মাস্ক সম্প্রতি টুইটারের সবচেয়ে বেশি শেয়ারের মালিক হয়েছেন। এখন সেখানে আলোচনা হবে, তিনি কোম্পানির পর্ষদে যুক্ত হতে চান কি না।

টুইটার পর্ষদে ইলন মাস্ক

যথারীতি বৈঠকস্থলে পৌঁছান টুইটারের চেয়ারম্যান ব্রেট টেলর। তবে সেখানে গিয়ে যে অবস্থা দেখেছেন, সেটা তিনি আশা করেননি। টেলর নাকি এ নিয়ে মাস্ককে লেখা খুদে বার্তায় বলেছিলেন, সম্প্রতি তাঁর বৈঠক করা ভেন্যুগুলোর মধ্যে এটা সবচেয়ে অদ্ভুত হিসেবে জয়ী হয়েছে।

যা হোক, শেষ পর্যন্ত ভালোয় ভালোয় বৈঠকটি শেষ হয়। মাস্ক টুইটারের পর্ষদে যোগ দিচ্ছেন বলে কিছুদিন পর ঘোষণা দেওয়া হয়।
এটা ছিল কেবলই শুরু। সিলিকন ভ্যালির ইতিহাসে পরবর্তী ছয় মাসে এটি ছিল সবচেয়ে নাটকীয়তায় ভরা একক ধাপের চুক্তিগুলোর একটি।

এপ্রিলের শুরুতে মনে হয়েছিল, টুইটার পর্ষদে নিজের অবস্থান নিয়ে মাস্ক সন্তুষ্ট। কীভাবে কোম্পানিতে পরিবর্তন আনা যায়, সেটা নিয়ে নিয়মিত টুইট করতে থাকেন তিনি।

টুইটার সিইওর সঙ্গে বিরোধ

টুইটারের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) পরাগ আগারওয়ালের সঙ্গে মাস্কের ব্যক্তিগত বৈঠকগুলো সুখকর ছিল না। কীভাবে প্রতিষ্ঠানের সমস্যা সমাধান করা যাবে, এ নিয়ে দুজনের মুখ–দেখাদেখি বন্ধ। একপর্যায়ে হতাশ হয়ে পড়েন মাস্ক।

চেয়ারম্যান টেলরকে পাঠানো খুদে বার্তায় মাস্ক লেখেন, ‘টুইটারের সমস্যা সমাধানে পরাগের সঙ্গে কথা বলে কোনো কাজ হবে না।’ তিনি বলেন, ‘জোরালো পদক্ষেপ গ্রহণ প্রয়োজন।’

টুইটার কেনার ঘোষণা

এরপর ১৪ এপ্রিল টুইটার পুরোপুরি কিনে নেওয়ার প্রকাশ্য ঘোষণা দেন এই ধনকুবের। তিনি এ জন্য একদাম ৪ হাজার ৪০০ কোটি ডলারের প্রস্তাব দেন।

প্রথমে মাস্কের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে টুইটার পর্ষদ। এমনকি জোরপূর্বক তিনি যাতে কোম্পানিটি কিনতে না পারেন, সে জন্য একটি বিধিও তৈরি করা হয়।

অবশ্য পরে মত ঘোরে টুইটারের। মাস্কের সঙ্গে চুক্তি করার সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে ২৫ এপ্রিল জানায় টুইটার পর্ষদ। মাস্কের প্রস্তাব তারা গ্রহণ করেছে বলেও ঘোষণা দেয় টুইটার।

উচ্ছ্বসিত মাস্ক টুইট করেন, ‘হ্যাঁ।’
মাস্কের যুক্তি ছিল, টুইটার তার পথ হারিয়েছে। তিনি বলেন, মত প্রকাশের ওপর টুইটার অতিমাত্রায় বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। বৈশ্বিক ‘মুক্ত আলোচনার অঙ্গন’ হিসেবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমটির উচিত, সবকিছুর ওপর মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে জায়গা করে দেওয়া।

সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা

মাস্কের সঙ্গে টুইটারের চুক্তির পরবর্তী সপ্তাহ ও মাসগুলোয় প্রযুক্তি খাতের পুঁজিবাজারে পতন দেখা যায়। টুইটারের শেয়ারের দামও পড়তে থাকে। এর পরপরই অনেক বিশ্লেষক প্রশ্ন করতে থাকেন, মাস্ক কি বেশি অর্থ দিয়ে টুইটার কেনার চুক্তি করেছেন কি না।
কিন্তু প্রকাশ্যে ভিন্ন প্রশ্ন করতে শুরু করেন মাস্ক। তিনি জানতে চান, টুইটারের প্রকৃত ব্যবহারকারীর সংখ্যাটা কত?

ফোর্বস ও ব্লুমবার্গের ধনকুবেরের তালিকায় বিশ্বের শীর্ষ ধনী ব্যক্তি ইলন মাস্ক। তাঁর সম্পদের পরিমাণ প্রায় ২৫ হাজার কোটি ডলার।
মাস্ক কয়েক বছর ধরে টুইটারের বট অ্যাকাউন্ট নিয়ে অভিযোগ করে আসছেন। তাঁর প্রস্তাব গ্রহণ করার পর টুইটারের কাছে প্রকৃত ব্যবহারকারীর তথ্য চান তিনি।

টুইটার নির্বাহীদের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দৈনিক সক্রিয় ব্যবহারকারীর তুলনায় বট অ্যাকাউন্টের সংখ্যা পাঁচ শতাংশের কম। তবে এমন তথ্যে মাস্ক ক্ষুব্ধ হন বলে মনে হয়েছে।

চুক্তিটি ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হয়। ৮ জুলাই মাস্ক ঘোষণা দেন, তিনি এই চুক্তি থেকে সরে দাঁড়াতে চান। অবশ্য তাঁর এমন ঘোষণা অপ্রত্যাশিত ছিল না।

তবে এটা বলাটা কঠিন, মাস্ক আরও কম দামে কোম্পানিটি কেনার চেষ্টা করছিলেন নাকি আসলেই চুক্তি থেকে সরে যেতে চেয়েছিলেন!

কাঠগড়ায় মাস্ক, অবশেষে টুইটার ক্রয়

টুইটার মাস্কের পথে হাঁটেনি। তাদের যুক্তি, কোম্পানিটি ক্রয়ে মাস্কের আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এখন আর চুক্তি থেকে সরে দাঁড়ানোর কোনো সুযোগ নেই।
বিষয়টি আদালতে গড়ায়। দুই পক্ষই বিপুল টাকা ব্যয় করে আইনজীবী নিয়োগ দেয়। মাস্ককে টুইটার কিনতে বাধ্য করা হবে কি না, এ বিষয়ে ১৭ অক্টোবর ডেলাওয়ারের আদালতে শুনানির দিন ধার্য ছিল।

আদালতের নথি অনুযায়ী, প্রকৃত ব্যবহারকারীর সংখ্যা কত, তা নিয়ে মাস্ককে পর্যাপ্ত তথ্য দেওয়ার দাবি করেছে টুইটার। তবে মাস্কের যুক্তি, প্রকাশ্যে যে সংখ্যা বলা হচ্ছে, তার চেয়ে টুইটারের বট অ্যাকাউন্টের সংখ্যা কয়েক গুণ বেশি। কোম্পানিটির বিরুদ্ধে প্রতারণারও অভিযোগ আনেন তিনি।

মাস্ক, টুইটার, বিচারক ও সাংবাদিকেরা সবাই যখন আদালতে মামলার বিষয়টি অনিবার্য ভেবে প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন আরেকটি মোড় ঘোরার ঘটনা ঘটল।

টুইটারের বিরুদ্ধে সব ধরনের বিষোদ্‌গারের পর হঠাৎ মাস্ক ঘোষণা দিলেন, তিনি চুক্তি করতে রাজি।
কোন কারণে মত পাল্টালেন মাস্ক? খুব সম্ভবত তিনি মনে করেছিলেন, মামলায় তিনি হেরে যাবেন।

টুইটারও চুক্তিতে ফেরার পক্ষে সায় দেয়। মামলা বাতিল না করে স্থগিত করার আবেদন জানায় তারা। চুক্তি সম্পাদনে স্থানীয় সময় ২৮ অক্টোবর বিকেল ৫টা নাগাদ সময় পান মাস্ক।

একটি চুক্তি যখন একটা সময় অকল্পনীয় ও অসম্ভবভাবে ভেঙে যাচ্ছে মনে হয়েছিল, অবশেষে সেটি সম্পন্ন হয়েছে বলেই মনে হচ্ছে।