নীলাকাশ টুডেঃ পঞ্চগড়ের করতোয়া নদীতে রবিবারের নৌকাডুবির ঘটনায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে চল্লিশ জনে। ডুবে যাওয়া শতাধিক যাত্রীবাহী ওই নৌকাটির আরো অনেক যাত্রী এখনো নিখোঁজ আছে। যদিও নিখোঁজের সঠিক সংখ্যা সম্পর্কে স্পষ্ট কোন ধারণা পাওয়া যাচ্ছে না। কিন্তু নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে করতোয়া নদীর তীরে তৈরি হয়েছে হৃদয় বিদারক দৃশ্য।

নিখোঁজদের মধ্যে রয়েছেন বোদা উপজেলার বটতলী গ্রামের হরিকিশোর এবং কণিকা রানী দম্পতি।

তাদের দুই সন্তান অজয় কুমার এবং উজ্জ্বল কুমার রবিবার দুপুর থেকেই নদীর পাড়ে বাবা-মাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে।

অজয়ের বয়স ১৪ আর উজ্জ্বলের বয়স ২২। বার বার মূর্ছা যাচ্ছে তারা।

তাদের মামা রিপন অধিকারী বলেন, দুই ভাই বাব-মায়ের শোকে অসুস্থ হয়ে পড়েছে।উজ্জ্বলকে এখন স্যালাইন দিয়ে রাখা হয়েছে।

রিপন অধিকারী বলেন, মহালয়ার অনুষ্ঠান দেখার জন্য তার বোন এবং বোন জামাইসহ তাদের পরিবারের আরো পাঁচজন অর্থাৎ মোট সাত জন ঐ নৌকাতে ছিল। কিন্তু একজন সাঁতার কেটে উঠে এলেও বাকি ছয়জন এখনো নিখোঁজ। এদের মধ্যে অজয় এবং উজ্জলের বাবা-মা রয়েছেন।

রিপন অধিকারী বলেন “আমার বোন (কণিকা রানী) আমাকে বললো চল এক সঙ্গে যাই, মহালয়ার অনুষ্ঠান দেখে আসি। আমি বললাম এখন যাবো না, পরে যাবো দুই ভাগনাকে সঙ্গে নিয়ে। তোমরা যাও। এই বলে আমি ঘরে শুয়ে ছিলাম। কিছুক্ষণ পরেই শুনি নৌকা ডুবে গেছে।

আমি দৌড়ে গেলাম নদীর পাড়ে। দেখলাম নৌকাটা যাত্রা শুরুর কিছুক্ষণ পরেই ডুবে গেছে। আমার পরিবারের সাতজন ছিল। আমার আরেক বোনের স্বামী উঠে আসতে পেরেছে বাকিদের এখনো পায়নি।

তিনি বলছিলেন, “আমার দুই ভাগনা ওদের বয়স কম, কাল থেকে নদীর পাড়ে বসে আছে। কান্না-কাটি করতে করতে বার বার মূর্ছা যাচ্ছে। অজয় কে ওষুধ দেয়া হয়েছে। আর উজ্জলের স্যালাইন দেয়া হচ্ছে”।

এদিকে করতোয়া নদীর পাড়ে নিখোঁজ স্বজনের জন্য অপেক্ষা করছেন অনেকে। তাদের মধ্যে গ্রি বাবু একজন। তার পরিবারের দুইজন মারা গেছেন, আর দুইজন এখনো নিখোঁজ।

গ্রি বাবু বলেন, “আমার শ্যালক এবং তার বোন এখনো নিখোঁজ। আর আমার স্ত্রীর মামী এবং খালার মরদেহ গতকালকেই (রবিবার) পাইছি। এখন আমি বাড়ি টিকতে পারছি নে। এই নদীর পাড়ে বসে আছি যদি বাকি দুইজনের কোন হদিশ পাওয়া যায় সেই আশায়”।

পঞ্চগড়ের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জহুরুল ইসলাম জানিয়েছেন, বোদা উপজেলায় ট্রলার ডুবে নিহত নারী ও শিশুসহ এ পর্যন্ত ৪০ জনের মরদেহ উদ্ধার করেছে দমকল বাহিনী। এদের মধ্যে ২২ জন নারী, ১১ জন শিশু। এদের মধ্যে ২৪ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয় রবিবার। বাকি ৬ জনের মৃতদেহ পাওয়া যায় সোমবার সকাল পর্যন্ত।

এই নৌকাডুবিতে নিহতের সংখ্যা আরো অনেক বাড়বে বলে আশঙ্কা আছে। নিখোঁজের সঠিক সংখ্যা উল্লেখ না করলেও দমকল বাহিনীর উপসহকারী পরিচালক মাহবুবুল ইসলাম বলেন, “অনেকে নিখোঁজ আছেন”।

বোদা উপজেলার নির্বাহী অফিসার সোলেমান আলী বলেন, এখন পর্যন্ত কতজন নিখোঁজ রয়েছেন সেটার সঠিক হিসেব দেয়া যাচ্ছে না।

তিনি বলেন, “দেখা যাচ্ছে একজন নিখোঁজ আছে, তার কথা এসে একাধিক ব্যক্তি বলে যাচ্ছেন আমাদের কাছে। সুতরাং বেশ কয়েকটি তালিকায় একই ব্যক্তির নাম আসছে। আবার কেউ হয়ত সাঁতরে উঠে এসেছেন কিন্তু অন্য আরেকজন জানেন না। তিনি এসে নিখোঁজের তালিকায় নাম দিয়ে যাচ্ছেন। এখন আমরা সব তালিকা করে যাচাই করে দেখছি, ঠিক কতজন নিখোঁজ আছেন”।

তবে জেলা প্রশাসক মি. ইসলাম বলেছেন, নিখোঁজের সংখ্যা চল্লিশের কম নয়।
নৌকা যোগে মহালয়ার অনুষ্ঠান দেখতে যাচ্ছিলেন সবাই।
রবিবার করতোয়া নদীতে দুপুর সোয়া দুইটার দিকে আনুমানিক ১০০ জনের বেশি যাত্রী নিয়ে ওই ট্রলারটি ডুবে যায়। দমকল বাহিনীর উদ্ধারকর্মী এবং ডুবুরিরা নদীতে উদ্ধারকাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার মাড়েয়া আউলিয়া ঘাট নামক জায়গায় এই ঘটনাটি ঘটেছে।

আউলিয়া ঘাটের অপর পাশেই রয়েছে বদেশ্বরী মন্দির। বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় উৎসব মহালয়া পালিত হয়েছে গতকাল রবিবার।

প্রাচীন ওই বদেশ্বরী মন্দিরে মহালয়া উপলক্ষে প্রতিবছরই অনেক বড় অনুষ্ঠান হয় এবং আশপাশের জেলাগুলো থেকে সনাতন ধর্মের বহু মানুষ এতে যোগ দেন।

করতোয়া নদীতে সারা বছরই পানি থাকে এবং এই নদীর ওপর কোন সেতু নেই। ফলে নদী পারাপারের জন্য নৌকা এবং ট্রলারই ভরসা। ফলে প্রতিদিনই নৌকা এবং ট্রলার চেপে প্রতিদিন শত শত মানুষ পার হয়ে পড়াশুনা ও কর্মস্থলে যান।