নীলাকাশ টুডেঃ প্রথম দিকে শামীম ওসমান কোনো মন্তব্য করেননি নির্বাচন নিয়ে। এমনকি এ নির্বাচন নিয়ে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের বৈঠকেও যাননি তিনি। তবে তাকে নিয়ে দুই প্রার্থীর তর্ক-বিতর্ক আর মন্তব্যের জেরে আর চুপ থাকতে পারেননি তিনি। জানিয়ে দেন- এবার জবাব দিবেন তিনি। এর পর ১০ জানুয়ারি সংবাদ সম্মেলনে জানিয়ে দেন আওয়ামী লীগ ও নৌকার বাইরে যাওয়ার উপায় নেই। নৌকা প্রতীকের কে প্রার্থী তা তিনি দেখেন না। তিনি শুধু নৌকা প্রতীকই দেখেন। এই বক্তব্যের পর পাল্টাপাল্টি মন্তব্য কিছুটা কমে আসে।

অবশ্য নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন উপলক্ষে ২০ ডিসেম্বর ঢাকা বিভাগের সাংগঠনিক দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের সঙ্গে নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর নেতাদের সেই বৈঠকে শেষ পর্যন্ত যাননি শামীম ওসমান। দলীয় সেই বৈঠকে না গেলেও তিনি ছিলেন তার প্রয়াত বাবা মা আর ভাইয়ের কবরে। তিনি হলেন দেশের অন্যতম প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা। আওয়ামী লীগ প্রার্থী ও সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াত আইভীর সঙ্গে রাজনৈতিক বৈরিতার কারণেই এ সভার দিকে নজর ছিল সবারই।

ওই দিন ধানমন্ডি দলীয় সভানেত্রীর সেই কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সভায় উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থী সেলিনা হায়াত আইভী। সেখানে কেন্দ্রীয় নেতাদের পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন নারায়ণগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম বাবু, সাবেক নারী আসনের সংসদ সদস্য হোসনে আরা বাবলী।

৫ জানুয়ারি প্রচারণাকালে নির্বাচনে শামীম ওসমানের অবস্থান কী, সমর্থন নিয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের প্রশ্নে বেশ বিরক্তি প্রকাশ করেন সরকারদলীয় মেয়র প্রার্থী ডা. সেলিনা হায়াত আইভী। নাসিক নির্বাচনে আওয়ামী লীগের এমপি শামীম ওসমান ‘খুব কি বেশি জরুরি’ এমন প্রশ্নও রাখেন তিনি। ৭ জানুয়ারি এক প্রশ্নের জবাবে আইভী বলেন, আওয়ামী লীগের মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব নেই। এমপি শামীম ওসমানের সঙ্গে নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা আছে। আদর্শগতভাবে উনিও আওয়ামী লীগ করেন, আমিও করি। স্থানীয় অনেক কিছুর সঙ্গে মতের অমিল থাকতে পারে, দ্বিমত থাকতে পারে কিন্তু শামীম ওসমানের সঙ্গে আমার কোনো দ্বন্দ্ব নেই।

তবে ৮ জানুয়ারি ডা. আইভীর এক বক্তব্যে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতির মাঠ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সেদিন তিনি কোনো গডফাদারের দিকে তাকিয়ে নির্বাচন করেন না বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, গতকাল বন্দরে তৈমুর প্রচারণা চালিয়েছেন, সেলিম ওসমানের জাতীয় পার্টির চারজন চেয়ারম্যান তার সঙ্গে ছিলেন। এতে প্রমাণিত হয় নারায়ণগঞ্জে যে গুঞ্জন ছিল তৈমুর আলম খন্দকার গডফাদার শামীম ওসমানের ক্যান্ডিডেট, গতকাল তা প্রমাণিত হয়েছে।

শনিবার বন্দরের ২৪নং ওয়ার্ডের দেউলি চৌরাপাড়া এলাকায় নির্বাচনী প্রচারণায় সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে আইভী আরও বলেন, হাইকমান্ড কালকে সব দেখেছে। এখানে অনুষ্ঠান হয়েছে, পত্রিকায়ও খবর এসেছে। তারা দেখেছেন এবং তারা এ বিষয়ে দেখবেন। আমি বলতে চাই- আমি নির্বাচন করি জনতার শক্তিতে। জনতাই আমার শক্তি, দল আমার মনোবল। এসব মিলিয়ে আমি নির্বাচন করি। আমি কোনো গডফাদারের দিকে তাকিয়ে নির্বাচন করি না। আমি বলেছি কালকে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানরা প্রকাশ্যে নেমেছেন। এতে প্রমাণিত হয়- কারা তার সঙ্গে আছেন, কারা তাকে সাপোর্ট দিচ্ছেন।

দলের সমর্থন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগে দ্বন্দ্ব স্পষ্ট হলো কিনা জানি না। সব নেতাকর্মী আমার সঙ্গে। প্রতিটি ওয়ার্ড লেভেল পর্যন্ত নেতাকর্মীরা আমার পাশে আছে। একমাত্র তিনি (শামীম ওসমান) দলের বাইরে গিয়ে তার লোকজনকে তৈমুর সাহেবের সঙ্গে দিচ্ছেন।

আইভী আরও বলেন, তৈমুর আলম খন্দকার গডফাদার শামীম ওসমান ও সেলিম ওসমানের প্রার্থী। তিনি বিএনপিরও প্রার্থী নন, জনতার প্রার্থীও নন। শামীম ওসমান তাকে প্রার্থী করেছেন। উনি বিএনপির প্রার্থী হলে ধানের শীষেই নির্বাচন করতেন। উনি গডফাদারের প্রার্থী। তিনি দন্তবিহীন গডফাদার, নতুন করে আবার উত্থান হতে শুরু করেছেন।

সেলিনা হায়াত আইভীর এমন মন্তব্যের পর আর চুপ থাকেননি শামীম ওসমান। ১০ জানুয়ারি সংবাদ সম্মেলন করেন নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের এমপি আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা শামীম ওসমান। নারায়ণগঞ্জের বাঁধন কমিউনিটি সেন্টারে ওই সংবাদ সম্মেলনে তিনি তার বক্তব্যে বলেছেন, এখানে কে প্রার্থী, হু কেয়ারস। কলাগাছ না আমগাছ সেটা দেখার বিষয় না। এটা আমার স্বাধীনতার নৌকা, এটা বঙ্গবন্ধুর নৌকা, এটা আমাদের ৪৯ জন লাশের নৌকা, চন্দন শীলের ২ পায়ের বিনিময়ের নৌকা। নৌকার বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

এছাড়া এক প্রতিক্রিয়ায় শামীম ওসমান বলেন, দুই দিন আগে একটি ভিডিও দেখলাম, সেখানে উনি (আইভী) বলছেন, শামীম ওসমান আমাদের নেতা। উনি বড়ভাই, আওয়ামী লীগের এমপি। দুই দিনের মধ্যে গডফাদার হয়ে গেলাম। আমাকে মনোনয়ন দিয়েছে আমার দল। আমি যদি গডফাদার হই, তাহলে আমাকে মনোনয়ন দিয়েছেন কে? কাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হলো? যে বলেছে, তার (আইভী) কাছে জিজ্ঞেস করেন, আপনি দুই দিন আগে এটা বলেছেন, দুই দিন পরে এটা বললেন। কোনটা সঠিক। তিনি প্রশ্ন রেখে আরও বলেন, দুই দিন আগে ছিলাম ভাই, এখন গডফাদার হলাম কীভাবে?

এদিকে রোববার বিকালে নিজ বাসভবনের ‘মজলুম মিলনায়তন’ এ আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলন করেন অ্যাডভোকেট তৈমুর আল খন্দকার। সেখানে তিনি বলেন, সরকারদলীয় মেয়র প্রার্থী যে রাজনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত মন্তব্য করেছেন, সে ব্যাপারে আমার স্পষ্ট মন্তব্য হলো সরকারদলীয় নেতাদের এই বিভেদ-বিভাজনই নারায়ণগঞ্জের উন্নয়নের প্রধান অন্তরায়। শামীম ওসমান সরকারদলীয় এমপি আর সেলিম ওসমান সরকারি দলের জোটবদ্ধ জাতীয় পার্টির এমপি। আমি তৈমুর আলম খন্দকার প্রথম দিন থেকেই বলছি শামীম ওসমানের পায়ে তৈমুর আলম খন্দকার হাঁটে না। গত ৫০ বছর ধরে মাটি ও মানুষের সঙ্গে রাজনীতি করতে করতে তৈমুর আলম খন্দকারের ভিত্তি এতটাই শক্ত অবস্থান হয়েছে যে, কোনো শামীম ওসমান বা সেলিম ওসমানের হয়ে আমাকে নির্বাচনে অভিনয়ে নামতে হবে না।