ডুবে যাওয়া শ্রীলঙ্কা জাগছে যেভাবে


MD Nuruzzaman প্রকাশের সময় : অগাস্ট ৩১, ২০২৩, ২:৪৫ পূর্বাহ্ন /
ডুবে যাওয়া শ্রীলঙ্কা জাগছে যেভাবে

 

এত কাছে তবু কত দূর! আগে থেকেই ঠিক করা হোটেলের খুব কাছে গিয়েও চেক ইন করার উপায় নেই। শ্রীলঙ্কার সাংস্কৃতিক রাজধানী ক্যান্ডির কলম্বো স্ট্রিট এবং এর আশপাশে সেই বিকেল থেকেই যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সন্ধ্যা থেকে শুরু হওয়া এখানকার অন্যতম ধর্মীয় উৎসব ‘এসালা পেরাহেরা’র নবম দিনের কার্যক্রম শেষ হতে হতে মঙ্গলবার রাত প্রায় ১২টা। সেই উৎসবে অংশ নিতে আসা মানুষের ভিড় ঠেলে যেখানে সুই গলানো মুশকিল, সেখানে বাক্স-পেটরা নিয়ে হোটেলে পৌঁছানো তো বহুদূর!

কলম্বো থেকে রাত সাড়ে ৮টায় ক্যান্ডি পৌঁছে গিয়েও তাই চলতে থাকে অপেক্ষা।

কখনো গাড়িতে বসেই, কখনো আবার বেরিয়ে উৎসব খানিকটা উপভোগের চেষ্টা। অদূরের ‘টেম্পল অব টুথ’ থেকে বের হওয়া মিছিলের তখন রাস্তা প্রদক্ষিণ চলছেই। গৌতম বুদ্ধের একটি দাঁত সেখানে সংরক্ষিত আছে বলেই মন্দিরের ওরকম নামকরণ। মন্দিরের সঙ্গে উৎসবের সম্পর্কও বোধগম্য এর ইংরেজি নাম শুনে, ‘দ্য ফেস্টিভাল অব টুথ’।

বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী থেকে শুরু করে ভিনদেশি পর্যটকদের কাছেও ক্যান্ডির অন্যতম সেরা আকর্ষণ এই মন্দির এবং বুদ্ধের দাঁত নিয়ে বের হওয়া মিছিল। এই মিছিল দেখতে স্থানীয় জনতার সঙ্গে অসংখ্য বিদেশি পর্যটকের উপস্থিতি আলাদাভাবে দৃষ্টি না কেড়ে পারে না। এমনিতে এ ধরনের উৎসবের জন্য পুলিশি নিরাপত্তাব্যবস্থাই যথেষ্ট হওয়ার কথা। অন্তত বাংলাদেশে তা-ই হয়।

কিন্তু এখানে নিরাপত্তাব্যবস্থায় কোনো ফাঁক না রাখতে উপস্থিত সামরিক বাহিনীও।

২০১৯ সালের ২১ এপ্রিল রাজধানী কলম্বোর একাধিক গির্জা ও হোটেলে আত্মঘাতী বোমা হামলায় হতাহতের সেই ঘটনাটি ছিল ‘ভারত মহাসাগরের মুক্তা’ শ্রীলঙ্কার জন্য প্রথম আঘাত। ধর্মীয় উপসনাস্থল হঠাৎ করেই পরিণত হয়েছিল বধ্যভূমিতে। তাতে নিরাপদ শ্রীলঙ্কা নিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে শুরু করেন বিদেশি পর্যটকরা। বানের জলের মতো ঢুকতে থাকা পর্যটকপ্রবাহেও তাই পড়ে ভাটার টান।

তবে সেখানেই শেষ নয়। এই দ্বীপরাষ্ট্রটির জন্য অপেক্ষায় ছিল আরো বড় দুটি ধাক্কা। মঙ্গলবার বিকেলে কলম্বোর বন্দরনায়েকে ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে নামার পর ক্যাসন্স ট্রাভেলসের কর্মী থারাঙ্গা প্রিয়াশান্থা তুলে ধরছিলেন সেই খতিয়ান, ‘পর পর তিনটি ধাক্কায় আমরা প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছিলাম। ইস্টার সানডের বোমা হামলার পর এলো কভিড। এরপর এলো অর্থনৈতিকভাবে দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার ধাক্কা।’

অর্থনৈতিক সংকটে চরম মূল্যস্ফীতির শিকার হয় শ্রীলঙ্কার ২২ মিলিয়ন মানুষ। সরকারের হাতে বৈদেশিক মুদ্রা না থাকায় ছিল না জ্বালানি ও নিত্যপণ্য আমদানির টাকা। ঋণে নিমজ্জিত দ্বীপদেশটিও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের অন্ধকারে তলিয়ে যেতে থাকে। তবে ডুবে যেতে যেতেও রচিত হতে থাকে তাদের ফিরে আসার গল্প। এই গল্প মুখে হাসি ফোটায় থারাঙ্গাদের মুখে, ‘এখন আমরা একটু একটু করে ঘুরে দাঁড়াচ্ছি। বলব না যে পর্যটন খাতে উপার্জন অনেক বেড়ে গেছে। তবে পর্যটক দিন দিন বাড়ছে।’

ক্যান্ডির ‘এসালা পেরাহেরা’ উৎসবের স্রেফ এক দিনের আয়োজনে চোখ বুলিয়েই সেটি দিব্যি বোঝা গেছে। ব্যবস্থাপনা উন্নত করে আর পর্যটন খাতকে প্রাধান্য দিয়ে অর্থনৈতিক ভিত আবার মজবুত করার চেষ্টায় এই দেশের সরকার। স্রেফ একটি তথ্যই ডুবে যেতে থাকা দেশটির আবার জেগে ওঠার ইঙ্গিত দিচ্ছে। গত জুলাই মাসে দেড় লাখ বিদেশি পর্যটক শ্রীলঙ্কা ভ্রমণ করে গেছেন। সময়ে সেই সংখ্যাও বাড়বেই। দেশটির ঘুরে দাঁড়ানোর গল্পে আরেকটি উদাহরণ শ্রীলঙ্কান এয়ারলাইনস। দেউলিয়া হওয়ার পথে সংস্থাটি নিজেদের দেশ থেকেও জ্বালানি সংগ্রহ করতে পারেনি। তবু তারা নিজেদের আন্তর্জাতিক প্রায় সব রুটই ধরে রেখেছিল ভারতের চেন্নাই এয়ারপোর্ট থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করে। ঘোরতর দুঃসময়েও জাপান, অস্ট্রেলিয়া এবং ফ্রান্সের মতো দূর গন্তব্যে নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনা করে অ্যাকাউন্ট ভরিয়েছে বৈদেশিক মুদ্রায়।

দিনকে দিন মুদ্রাস্ফীতির মধ্যেও ভরছে তাদের কোষাগার। কলম্বো আসার দিন ফ্লাইট ও বন্দরনায়েকে এয়ারপোর্টে মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারমুখী বাংলাদেশি জনশক্তির ভিড় দেখেই বোঝা যাচ্ছিল যে গ্রাহক হিসেবে এই শ্রেণিকেও আকৃষ্ট করতে পেরেছে শ্রীলঙ্কান এয়ারলাইনস। জেগে উঠতে থাকা শ্রীলঙ্কায় আবার ফিরছেন পর্যটকরা, যা বাংলাদেশের আফসোস বাড়ানোর পক্ষেও যথেষ্ট। কক্সবাজার আছে, সুন্দরবন আছে, আছে রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থাও। কিন্তু পর্যটকের ঢল তো নামতে দেখা যায় না।

শ্রীলঙ্কা এখানেই ডুবে গিয়েও জেগে যায়! সূত্র কালের কন্ঠ