নীলাকাশ টুডেঃ বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটে চরম অস্থিরতা চলছে। মূল্যায়ন না পাওয়ার অভিযোগ তুলে একের পর এক জোট ছাড়ছে শরিকরা। বিএনপি ‘একলা চলো’ নীতি অনুসরণ করার কারণেই মূলত এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। যদিও বিএনপি নেতাদের দাবি-সরকার জোট ভাঙার চেষ্টা করছে। তাদের চাপেই কয়েকটি দল জোট ছেড়েছে। এ নিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন দলের নীতিনির্ধারকরা।

জোটে থাকা নিবন্ধিত দুটি রাজনৈতিক দলের তিন সিনিয়র নেতা প্রায় অভিন্ন তথ্য দিয়ে জানান, আগামী জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপির একটি অংশ আবারও কারও ফাঁদে পা দিয়েছে-এমন ধারণা তাদের। ২০ দলীয় জোট নিয়ে বিএনপির মধ্যে এখন মতবিরোধ চলছে। একটি অংশ ২০ দলকে গুরুত্ব দিতে চায়, আরেক অংশ গুরুত্ব না দেওয়ার পক্ষে। যারা গুরুত্ব দিতে চায় না, তারা নির্বাচনের আগে বিএনপিকে একঘরে রাখার প্রক্রিয়ায় ব্যস্ত। একক ভাবে আন্দোলনে সফল হওয়ার ইতিহাস বিরল। বরং রাজনৈতিক ভুলের কারণে ভবিষ্যতে এমনও দেখা যেতে পারে বিএনপিকে রেখে আরেকটি বড় জোট হচ্ছে। সেই জোট আগামী নির্বাচনেও যেতে পারে। তাই বিএনপি যে পথে হাঁটছে, তখন তাদের কিছুই করার থাকবে না।

তারা আরও বলেন, বিএনপির কয়েকজন নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতার সাম্প্রতিক কার্যক্রমে মনে হয়েছে, তারা জোটে থাকা ইসলামি দলগুলোর ব্যাপারে খুব একটা আগ্রহী নন। অন্যান্য শরিকদের সঙ্গেও সুসম্পর্ক রাখতে চাইছে না। আমরা জোট করেছি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে। এই জোট রক্ষা ও ঐক্যবদ্ধ রাখার জন্য এখন পর্যন্ত তিনিই ভূমিকা রেখেছেন। খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পর থেকে বিএনপি জোটের শরিকদের তেমন মূল্যায়ন করছে না। এখন তো শরিকদের সঙ্গে যোগাযোগও বন্ধ করে দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বৈঠক পর্যন্ত হয় না। অবশ্য বিএনপির একাধিক নীতিনির্ধারক জানান, ২০ দল ভাঙার পেছনে সরকারের ভূমিকা রয়েছে। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপিকে দুর্বল করতে বিকল্প আরেকটি জোট গঠনের তৎপরতা চলছে। বিএনপির বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলে জোট ছাড়ার ঘটনা ওই প্রক্রিয়ারই একটি অংশ।

ওইসব নেতা আরও জানান, ২০ দল একটি নির্বাচনি জোট। বড় দল হিসাবে বিভিন্ন কর্মসূচিসহ নানা ইস্যুতে বিএনপির একক সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার আছে। সেখানে ক্ষোভ বা হতাশার কিছু নেই। নানা ষড়যন্ত্রের মধ্যেও জোটের ঐক্য অটুট আছে।

দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ২০ দলীয় জোটে কোনো সমস্যা নেই। যারা জোট ছেড়েছে, তারা সরকারের চাপেই ছেড়েছে। আমরা মনে করি, সরকার বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে অনৈক্য সৃষ্টির চেষ্টা করছে, এটা এরই অংশ। সরকার জোট ভাঙার চেষ্টা চালাচ্ছে।

শুক্রবার সপ্তম দল হিসাবে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট ত্যাগ করে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল খেলাফত মজলিস। এর আগে ২০১৬ সালের ৭ জুন ২০ দলীয় জোট ছেড়ে যায় মুফতি ফজলুল হক আমিনীর প্রতিষ্ঠিত ইসলামি ঐক্যজোট (নিবন্ধিত)। ২০১৮ সালের ১৬ অক্টোবর ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি-ন্যাপ (নিবন্ধিত), ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এনডিপি) ও লেবার পার্টি, ২০১৯ সালের ৬ মে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি-বিজেপির আন্দালিব রহমান পার্থ (নিবন্ধিত) এবং ১৪ জুলাই জোট ছেড়ে যায় জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম (নিবন্ধিত) । বিজেপি ছাড়া এসব দলের একটি অংশ ২০-দলীয় জোটে থাকলেও তাদের নিবন্ধন নেই।

জোটে বিএনপি ছাড়া এখন নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল আছে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি-এলডিপি ও বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি। এলডিপির সভাপতি কর্নেল (অব.) ড. অলি আহমদ বলেন, জোটে যেহেতু একে অপরের সঙ্গে দূরত্ব বেড়ে যাচ্ছে, অনেকের মধ্যে হতাশা কাজ করছে এবং ভালো ভবিষ্যৎ দেখছে না। তাই ঘনঘন বৈঠক হলে সবাই তার সমস্যা নিয়ে আলোচনা করতে পারত এবং সমাধান পেত। তাহলে এ ধরনের হতাশা কাজ করত না, দূরত্ব সৃষ্টি হতো না, কেউ জোট ছেড়েও যেত না। সবাইকে নিয়ে আলাপ -আলোচনা করে সমাধান করা বা প্রত্যেক বিষয়েই কিছু ধারণা দেওয়াটা রাজনীতিতে অতি জরুরি। জনগণকেও যদি আমরা অন্ধকারে রেখে কাজ করি, তারাও আমাদের সমর্থন করবে না।

কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম মনে করেন, জোটে থাকা বা না থাকা একান্ত ভাবেই একটি দলের নিজস্ব এখতিয়ার। এই সম্পর্ক গড়ে উঠে প্রধান শরিক বিএনপি এবং জোটে থাকা অন্যান্য দলের মধ্যে। আমরা মনে করি, আগামী দিনেও সম্মিলিত সংগ্রাম প্রয়োজন হবে। অতএব আত্মসমালোচনা মূলক মূল্যায়নের মাধ্যমে জোটকে শক্তিশালী করা বা সম্প্রসারিত করা প্রয়োজন।

আরেক শরিক দল ন্যাশনাল পিপলস পার্টির (এনপিপি) চেয়ারম্যান ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ বলেন, মূলত যারা জোট ছেড়ে চলে গেছে, তারা ইসলামি দল। তাদের ওপর সরকারের চাপ আছে, এটাও যেমন ঠিক, আবার দীর্ঘদিন ধরে জোটের বৈঠক হচ্ছে না-এটাও কারণ। যত চাপ থাকুক, বৈঠক যদি দুই মাসেও একবার হতো এই দলগুলো যেত না। তখন তারা এই কথা বলত পারত না যে, নির্বাচনের পর কোনো বৈঠক হয়নি, নিষ্ক্রিয় করে ফেলেছে। বিএনপির উচিত হবে জোটকে বেগবান করা। বিএনপি যেহেতু নেতৃত্বে, তাই তাদেরই সব শরিকের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে খুব শিগগিরই একটি বৈঠক ডেকে ভুল বোঝাবুঝির অবসান করা উচিত।